আম্মু আমাকে আড়ালে নিয়ে যেয়ে বললেন,
-” দেখেছিস হাসিবের মা কত্ত ভালো। এমন শ্বাশুড়ি পাওয়া যায় নাকি আজকাল। আমরা যা করছি সব তোর ভালোর জন্যই করছি।”


আমি বড্ড দ্বিধায় পড়ে আছি দুটো বিষয় নিয়ে।
প্রথমত, হাসিবের মা এতক্ষন আমাকে যা বললেন, আসলেই কি এমন চিন্তাধারার লোক পৃথিবীতে আছে? উনাকে কেমন যেনো একটু বেশিই ভালো মনে হচ্ছে। আসলেই কি উনি এতটা ভালো? তবে অবশ্য আমার মাঝে তো তেমন কিছুই নেই যে আমাকে মিথ্যা নাটক করে তার ছেলের সাথে বিয়ে দিতে হবে। তাছাড়া হাসিব তো যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন ছেলে। তাহলে উনি কেনো মিথ্যা নাটক করবে?
দ্বিতীয়ত, বররপক্ষ এসেছে একঘন্টার উপরে হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আজ হাসিব আমার সাথে একবারও কথা বলতে আসেনি। বরং আমার কাছ থেকে কেমন যেনো লুকাতে চাচ্ছে। ঘটনা কিছুই বুঝতে পারছি না। গতকাল কত কথাই না বললো আমাকে, তার উপর আবার জোর করে আমার হাত থেকে আঙুরও খেলো। অথচ আজ আমি যেদিক যাচ্ছি, হাসিব সেখান থেকে সরে যাচ্ছে। কি চলছে এই ছেলের মনে কে জানে?
বিয়ে খুব ভালোভাবেই সম্পন্ন হলো। নিপাকে বিদায় দিয়ে বাসায় আসলাম। বাসায় আসার পর বড় আপা আমাকে জিজ্ঞেস করলো,
-” কি রে হাসিবের সাথে আজ তোর কথা হয়নি?”
-” এই কথা কেনো জিজ্ঞেস করছিস?”
-” নাহ আজ তোকে একবারের জন্যও হাসিবের সাথে কথাও বলতে দেখিনি, ধারে কাছেও যেতে দেখিনি। তাই জিজ্ঞেস করলাম।”
-” কি জানি আপা!! আজ উনাকে দেখলাম আমার কাছ থেকে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছেন। আমার সামনে আসতেই চায়নি।”
ঠিক এমন সময় আম্মু ভয়ানক এক চেহারা নিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলো,
-” নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে মানে?? তুই ওকে আজেবাজে কিছু বলেছিস নিশ্চয়ই। তোর কোনো আজেবাজে কথার কারনে যদি বিয়েটা ভেঙে যায় তাহলে তুই বুঝে রাখিস। তোকে আমি সেদিনই রিকশাওয়ালার সাথে বিয়ে দিয়ে দিবো।”
-” উফফ,, আম্মু আমি এমন কিছুই করিনি।আমার কথা বিশ্বাস না হলে তুমি উনাকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করো।”
আমি সেখান থেকে উঠেচলে আসলাম। বিরক্তিকর একটা অবস্থায় পড়ে আছি। যত্তসব ফালতু সন্দেহ আমার মা আমাকে নিয়ে করছে। রুমে এসে ফ্রেশ হলাম। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। মাগরিবের আযান দিয়েছে দশ মিনিট হলো। নামাজ পড়া শেষে ছাদের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হতে যাবো এমন সময় আম্মু আবার চেঁচামেচি শুরু করলো।
-” এই মেয়ে, তুই এই সময় ছাদে কেনো যাচ্ছিস?”
-” গেলে কি হবে?”
-” গেলে কি হবে মানে? এমন সময় কেউ ছাদে যায় নাকি?”
-” এমন ভাবে বলছো মনে হয় জীবনে কোনোদিন এই সময় আমি ছাদে যাইনি?”
– ” গিয়েছিস,,,,,, কিন্তু তখন কথা এক ছিলো আর এখনকার কথা আরেক। তোর এখন বিয়ের কথা চলছে। আর কিছুদিনের মধ্যেই তোর বিয়ে হয়ে যাবে। যদি তোর উপর কোনো কুদৃষ্টি পড়ে তখন কি হবে?”
মেজাজ ভয়ংকর রকমের খারাপ হচ্ছে আমার। আপা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আম্মুকে বললো,
-” আম্মু তুমি ভয় পেও না। আমি যাচ্ছি মাইশার সাথে। কিছু হবে না।”
আপা আমার সাথে ছাদে এসে বসলো। আমাকে বললো,
-” মাইশা এমন কত কথাই এখন তোকে শুনতে হবে। ভুলে গিয়েছিস আমার বেলায় কি হয়ছিলো? নিয়াজের সাথে যখন আমার বিয়ের কথা পাকা হলো এরপর তো আম্মু আমাকে দুইমাস বাসা থেকেই বেরহতে দেয়নি। বিয়ের দিন সকালে পার্লারেও পাঠাতে চায়নি। আম্মু তো বলছিলো পার্লার থেকে মহিলাকে বাসায় এনে আমাকে সাজাবে। ছোট খালা শেষমেষ আমাকে জোর করে বাসা থেকে বের করে নিয়ে গিয়েছিলেন।”
-” আমি বুঝিনা আপা,,,,, আম্মু এমন কেনো করে।”
-” উনি আমাদের মা তো, তাই এমন করে। মায়েরা সন্তানের ব্যাপারে over protective হয়। হতে পারে আমরা যখন মা হবো তখন আমরাও এমন করবো।”
ছাদে বসে অনেকক্ষন আপা আর আমি গল্প করলাম। কখন যে রাত সাড়ে দশটা বেজে গেলো টেরই পাইনি। আব্বু এসে খাবার খেতে যাওয়ার জন্য ডেকে গেলো। নিচে যেয়ে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে কিছুক্ষন টিভি দেখে শুতে গেলাম। আজ আপা আমি একসাথে ঘুমাবো। দুলাভাই নিপার বিয়েটা attend করেই চলে গেলো অফিসের কাজে চট্টগ্রাম। ওখানে সপ্তাহখানেক থাকবেন। তাই আপা এই বাসাতেই থাকবে। তবে অবশ্য আপা আমার সাথে রাতে থাকলেও ওর আত্মাটা পড়ে থাকে দুলাভাইয়ের কাছে। আপা যতবারই আমাদের বাসায় এসে থাকে ততবার প্রতিদিন দুলাভাই এর সাথে রাত তিনটা চারটা পর্যন্ত ফোনে কথা বলে। শুনেছি প্রেম করে বিয়ে করার পর নাকি লোকজনের প্রেম কমে যায়। কিন্তু এদের ক্ষেত্রে ঘটনা পুরোটাই উল্টো। এদের প্রেম বিয়ের পর আরও বেশি বেড়েছি। দুলাভাই আপাকে অসম্ভব রকমের ভালোবাসেন। বিয়ের চার বছরেও আপার বাচ্চা হয়নি। দুলাভাই আপাকে আজ পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো কথা বলে দেখেননি। উল্টো কেউ যদি আপাকে এসব বিষয়ে কথা বলতে যায় তাহলে দুলাভাই সাফ তাদেরকে বলে দেন, তারা যেনো আপাকে কিছু না বলে। এতে আপা কষ্ট পায়। উনি চাননা কোনোভাবেই আপা কষ্ট পাক। সাড়ে বারোটা বাজে। আপা ফোনে কথা বলছে। আমার ব্যাপক ঘুম পাচ্ছে। আমিও কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম টেরই পাইনি। হঠাৎ আপা আমাকে ডেকে উঠালেন। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি আড়াইটা বাজে। আপাকে জিজ্ঞেস করলাম,
-” কি সমস্যা? ডাকছো কেনো?”
-” হাসিব ফোন করেছে। রিসিভ কর। আর শোন লাউড স্পিকারে দিবি। আমি আর তোর দুলাভাই শুনবো।”
-” ধুর আপা ঘুমাতে দে তো।”
-” উফফ,,, তোকে যা বলছি তা কর।”
আপার জোরাজুরিতে ফোন রিসিভ করে লাউড স্পিকারে দিলাম।
-” হ্যালো,,,,,”
-” এই নিয়ে তিনবার ফোন করলাম। কিন্তু তোমার তো সেদিক হুঁশ নেই। তুমি তো আরামে ঘুমাচ্ছো।”
-” ঘুমের সময় ঘুমাবো না তো কি করবো?”
-” আমার ঘুম নষ্ট করে দিয়ে নিজে আরাম করে ঘুমাচ্ছো এটা কি ঠিক?”
-” আমি কি বলেছি না কি আপনি ঘুমাতে পারবেন না?”
-” বলোনি, কিন্তু তোমার কথা ভেবে ভেবে তো ঘুমটাই উড়ে গেলো। তুমি হয়তবা একটু অবাক হয়েছো কেনো তোমার সাথে আজ কথা বলিনি? তোমাকে আজকে এতটাই সুনদর দেখাচ্ছিলো যে নিজের মাথাটা আর ঠিক রাখতে পারছিলাম না। তোমার দিকে যতবার চোখ যাচ্ছিলো ততবার ইচ্ছে হচ্ছিলো তোমাকে একটাবার জড়িয়ে ধরি। দেখছিলে না তোমার কাছ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছিলাম। কত কষ্টে নিজেকে কন্ট্রোল করেছি তা আমারটা আমি জানি।”
আপা আর দুলাভাই অট্ট হাসি দিয়ে বসলেন। আপা হাসছে আমার সাথে বসে আর দুলাভাই হাসছে ফোনের ঐ পাড় থেকে। আপা হাসিবকে বললো,
-” কন্ট্রোল হাসিব , কন্ট্রোল….”
-” এই তুমি তোমার আপাকে সব শুনিয়েছো? কি যে করোনা মাইশা? আচ্ছা যাই হোক শুনিয়েই যেহেতু ফেলেছো তাহলে এটাও বলে রাখি, আপা এসব কিন্তু ঠিক না। আমি কি কখনো আপনার আর দুলাভাই এর কথা শুনতে চেয়েছি? আর মাইশা তুমি,,,,, আগামিকাল বৌ-ভাতে এমন সেজেগুজে আমার সামনে ঘুরঘুর করবে না। আজ নিজেকে অনেক কষ্টে কন্ট্রোল করেছি। কাল যদি তোমাকে এই রুপে দেখি তাহলে কখন কি করে বসবো তার কোনো ঠিক নেই। প্লিজ, আমার কাছ থেকে দূরে থেকো।”
এই কথা বলে হাসিব ফোনটা রেখে দিলো। আপা আর দুলাভাই হেসেই যাচ্ছেন। ধুর,,, কি লজ্জাজনক অবস্থাতেই না পড়লাম। আগে যদি জানতাম উনি এসব বলবেন তাহলে ফোন লাউডস্পিকারেই দিতাম না। লাউডস্পিকার না, ফোনটা রিসিভই করতাম না। নির্লজ্জ ছেলে কোথাকার,,,,,,
(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *